শাহরিয়ার কবীর শেখ মুজিবকে অহরহ গালাগালি করতেন – বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খ-কালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিবরণ

শাহরিয়ার কবীর লেখক শিবিরের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় সে যে সব চক্রান্তমূলক ও হঠকারী কাজ করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল তারেক মাসুদ, পিয়াস করিম, আজফার, আজিজসহ কয়েকজনকে কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়াই লেখক শিবির থেকে বহিস্কার করা। এভাবে কাজ করার ফলে ঢাকার বাইরে তো দূরের কথা, ঢাকাতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরোক্ত অধ্যাপকবৃন্দ এবং কাজী নূরুজ্জামান ও বিনোদ দাশগুপ্ত ছাড়া তাঁর সাথে আর কেউই ছিলেন না। শাহরিয়ার এবং অধ্যাপকদের এমনই ধারণা ছিল যে, তাঁরা লেখক শিবির সম্মেলন বয়কট করলে সম্মেলন ভেস্তে যাবে! এজন্য তাঁরা চিন্তা করেছিলেন সম্মেলন  বয়কট করার ঘোষণা দিয়ে তাঁরা একটি সংবাদপত্রে বিবৃতি দেবেন। আবরার এ বিষয়ে আমাকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোন কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁরা এ রকম কোন বিবৃতি দিতে পারেন নি। আবরার আমাকে বলেছেন যে, সে সময় তাঁরা আবু হেনা মোস্তফা কামালের থেকেও একটা বিবৃতিতে সই করিয়ে নিয়েছিলেন, যদিও তিনি লেখক শিবিরের সদস্য ছিলেন না। আবু হেনা নিজে এটা বলেছিলেন আবরারকে।
বিবৃতি দিতে না পারলেও তাঁরা অন্য এক চক্রান্ত করেছিলেন। তখন কর্ণেল কাজী নুরুজ্জামান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বা ঐ নামে কোন সংগঠনের সভাপতি। তাঁদের অফিস ছিল শান্তিনগরের চৌরাস্তার কাছে বেলী রোডে। সম্মেলনের কিছু আগে শোনা গেল, সেই মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের কিছু লোক দিয়ে শাহরিয়ার কবীররা আমাদের সম্মেলনের ওপর হামলা করবেন। এটা শোনার পর আমাদের লোকদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হলো। তাঁরা অনেকে সেই ধরনের সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলেন।
অধ্যাপকরা নিজেদের সম্পর্কে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন। তাঁরা মনে করতেন তাঁদের উপস্থিতি ছাড়া লেখক শিবির তার গুরুত্ব হারাবে এবং সম্মেলন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এই উচ্চ ধারণার বশবর্তী হয়ে তাঁরা আবরার চৌধুরীর কাছে অধ্যাপক আহমেদ কামালের মাধ্যমে এক প্রস্তাব পাঠালেন। তাঁদের এই প্রস্তাব আমরা মেনে নিলে তাঁরা লেখক শিবিরের সম্মেলনে যোগদান করবেন। অন্যথায় তাঁরা সম্মেলনের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে বিবৃতি দেবেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল তিনটি। প্রথমতঃ বদরুদ্দীন উমরকে লেখক শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা যাবে না। দ্বিতীয়তঃ বিনোদ দাশ গুপ্তকে লেখক শিবিরের সভাপতি করতে হবে। তৃতীয়তঃ অধ্যাপক সাইদুর রহমানকে লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক করতে হবে।
এই অদ্ভূত এবং চরম অগণতান্ত্রিক প্রস্তাব তাঁরা কিভাবে পাঠাতে পেরেছিলেন, এটা রীতিমত এক বিস্ময়কর ব্যাপার। শুধু অদ্ভূত এবং অগণতান্ত্রিক নয়, এ প্রস্তাব ছিল একেবারেই কান্ডজ্ঞানশূন্য। যেখানে ঢাকাসহ সারা দেশে লেখক শিবিরের ৬০টির বেশী শাখায় তাঁদের কোন প্রভাবই ছিল না, সেখানে এই প্রস্তাব যে আমাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হবে, এটাই বা তাঁরা ভাবলেন কিভাবে? কিভাবে তাঁরা ভাবলেন, তাঁরা সম্মেলনে যোগদান না করলে সম্মেলন ব্যর্থ হবে। সম্মেলনে বিঘœ সৃষ্টির জন্য তাঁরা সব রকম চেষ্টাই করছিলেন। এ সময় শাহরিয়ার কবীর সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’ কাজ করতেন। তাতে ‘সাংস্কৃতিক সংবাদে’ এই মর্মে এক সংবাদ প্রকাশিত হলো যে, সব লেখকরা লেখক শিবির থেকে পদত্যাগ করে বের হয়ে গেছেন। এই মিথ্যা সংবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আবরার চৌধুরী বিচিত্রায় একটি চিঠি দেন, যা মাহফুজুল্লাহর সহায়তায় তাতে ছাপা হয়েছিল। এছাড়া তাদের আরও চেষ্টা ছিল। সম্মেলনের প্রতিনিধিদের থাকার একটা ব্যবস্থা হয়েছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বাইরে তাদের একটা বিল্ডিংএ। একজন অধ্যাপকের মাধ্যমে তারা এর অনুমতি বাতিল করিয়েছিল। এক কথায় বলা চলে, চক্রান্ত করতে গিয়ে তাদের নীচতার সীমা ছিল না।
মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দিয়ে সম্মেলনে যে হামলার পরিকল্পনার কথা শোনা গিয়েছিল সেটা আর হয় নি। কারণ সম্মেলনের ঠিক আগেই হঠাৎ করে প্রেসিডেন্ট এরশাদ মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনটির অফিস দখল করে কর্ণেল নূরুজ্জামানসহ অন্যদেরকে সেখান থেকে বের করে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক আহমেদ কামালের মাধ্যমে চক্রান্তকারীরা যে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন সেটা সকলেই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাঁদের অন্যান্য চক্রান্তও তাঁদের কোন কাজে আসে নি। এ কারণে তাঁরা কেউই সম্মেলনে উপস্থিত থাকেন নি, যদিও আমরা তাঁদেরকে বলেছিলাম লেখক শিবির একটি গণতান্ত্রিক সংগঠন। এই সংগঠনে কে কোন পদে থাকবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত সম্মেলনেই নিতে হবে। তাঁরা সম্মেলনে এসে নিজেদের এই প্রস্তাব উত্থাপিত করতে পারেন। কিন্তু সম্মেলনে উপরের অধ্যাপকবৃন্দ থেকে নিয়ে শাহরিয়ার কবীর, বিনোদ দাশগুপ্ত বা কাজী নূরুজ্জামান কেউই উপস্থিত থাকেন নি।
কয়েকদিন আগে শাহরিয়ারের একটি লেখায় দেখলাম তিনি বলছেন ঐ সম্মেলনের সময় তিনি নিজে সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে প্রতিনিধিদের কাছে ব্যাখ্যা করে জানিয়েছিলেন, কেন তাঁরা সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করছেন না। এর থেকে বড় ও হীন মিথ্যা আর কিছুই হতে পারে না। কারণ শাহরিয়ার কবীর এবং উপরোক্ত অন্যেরা কেউই সম্মেলনে উপস্থিত থাকা তো দূরের কথা, ধারে কাছেও ছিলেন না। শাহরিয়ার যে নীচতার  ক্ষেত্রে কতদূর নামতে পারেন এর মধ্যেই সেটা দেখা যায়। শাহরিয়ার সম্মেলনে নিজে উপস্থিত থেকে বক্তৃতা করার কথা লিখেছেন এটা শুনে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবরার চৌধুরী এবং ঐ সম্মেলনে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আনু মুহাম্মদ খুবই অবাক হলেন।
আমার আত্মজীবনীর বিবরণ থেকে শাহরিয়ারকে এই পর্যায়ে বিদায় করার আগে তাঁর সম্পর্কে এখানে একটি বিষয় বলা দরকার। শাহরিয়ার এখন আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একজন পাণ্ডা ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে জোর গলায় শেখ মুজিবের গুণকীর্তন, আওয়ামী লীগ রাজনীতির ধ্বজাধারী এবং তাদের ধারার এক বিরাট সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী পুরুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়ে বাতাস অনেক গরম করছেন। শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ ইত্যাদি বলছেন বলিষ্ঠ কণ্ঠে। কিন্তু পূর্ব বাংলার কমিউনিষ্ট পার্টিতে এবং পরে আমাদের সংগঠনে থাকার সময় তিনি শেখ মুজিবকে অহরহ গালাগালি করতেন, নোংরা ভাষাও ব্যবহার করতেন। একবার বরিশালে অশ্বিনী কুমার টাউন হলে লেখক শিবিরের এক সভায় শেখ মুজিবের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এত বিশ্রী ভাষা ব্যবহার করেছিলেন যাতে সভায় উপস্থিত অনেকের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তাঁর কোন নীতিজ্ঞান, কোন লজ্জা শরম এবং সর্বোপরি আত্মসম্মান জ্ঞান না থাকায় তিনি এখন আওয়ামী ঘরনার এক বীর বুদ্ধিজীবী হিসেবে নানা কীর্তির মাধ্যমে অবদান রাখছেন। আমাদের সংগঠনে চক্রান্ত করার লোকের অভাব থাকে নি। কিন্তু শাহরিয়ার কবীরের মত এত দক্ষ, চতুর এবং হীন চক্রান্তকারী আর কেউই আগে অথবা পরে আর আসে নি। বেশ কিছুদিন কাজী নূরুজ্জামান শাহরিয়ারের সাথে মিলে আমাদের বিরোধিতা করলেও পরে তাঁর সাথে শাহরিয়ারের সম্পর্ক খুব খারাপ হয়। সে সময় তিনি শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে আমাকে অনেক কথা বলেছিলেন। এছাড়া তিনি তাঁর স্ত্রী সুলতানা ভাবী শাহরিয়ার সম্পর্কে আমাকে এবং আমাদের সংগঠনের অন্য দুই এক জনের কাছে যা বলেছিলেন সেটা লেখা যায় না।
১৯৮১ সালে চক্রান্তকারীদের তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সম্মেলন সফল করার জন্য সব রকম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলাম। বাইরের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি যাতে ভাল হয় তার চেষ্টা করেছিলাম। কাজেই উপস্থিতি খুব ভাল ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি এস সি বড় মিলনায়তন প্রতিনিধিদের দ্বারা ভর্তি ছিল। এই সম্মেলনের থেকে বড় কোন সম্মেলন লেখক শিবিরের আর হয় নি, যদিও বড় সম্মেলন পরে আরও হয়েছিল। সম্মেলনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ভাল ছিল। নাচ, গান, নাটক হয়েছিল।
সম্মেলনে আমি সভাপতিত্ব করেছিলাম। লেখক শিবিরের এক নোতুন সাংগঠনিক ঘোষণাপত্রের খসড়া আমি তৈরী করেছিলাম, যা সম্মেলনে গৃহীত হয়েছিল। আবরার চৌধুরী ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে দ্বিতীয়বার লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদক থাকতে অনিচ্ছার কথা জানালে আমরা আনু মুহাম্মদকে সাধারণ সম্পাদক করার প্রস্তাব করি এবং তা গৃহীত হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির যে নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল সেটাও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল। আমি সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলাম। চক্রান্তকারী অধ্যাপকবৃন্দসহ অন্য কোন চক্রান্তকারীদেরই লেখক শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আর রাখা হয় নি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।