সদ্য সমাপ্ত ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৬ মেলায় ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’ ভিডিওসহ

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি তাদের স্টলে যে অত্যাধুনিক রোবটি প্রজেক্ট হিসেবে দেখিয়েছে সেটি মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা। এতে অনেকের ধারণা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে ডিজিটাল জালিয়াতি করেছেন তারা।

অনুসন্ধানে রোবটটির সাথে হুবহু মিল পাওয়া গেছে ফ্রান্সের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলদেবারানের তৈরী ‘নাও’ (NAO) নামের একটি রোবটের। ‘ধ্রব’ রোবটের কার্যকারিতার যে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, তার সাথেও হুবহু মিল আছে ২০০৮ সালে আবিস্কৃত ‘নাও’ রোবটটির।

রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় আয়োজিত সদ্য সমাপ্ত ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৬ মেলায় আলোচনায় ছিল কথা বলতে পারা ‘ধ্রুব’ নামক রোবট। ধ্রুব মানুষের মতো কথা বলতে পারে এবং সব ধরনের যোগাযোগ ও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।

গত বুধবার ‘রোবট ধ্রুব’ তাক লাগিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। ‘মাই নেম ইজ ধ্রুব, আই অ্যাম প্রিভিলেজড টু রিকোয়েস্ট টু ইনাগোরেট দ্য ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৬’ বলে মেলা উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানায় সে।

রোবটের এমন কাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উৎফুল্ল। হাসতে হাসতেই উদ্বোধন করেন দেশের সর্ববৃহৎ এই প্রযুক্তি মেলা। এরপর ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ এবং সবশেষে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানায় রোবট ধ্রুব।

সবই ঠিকঠাক ছিল এ বিশাল অর্জনে। কিন্তু আপত্তি বেধে গেল যখন দাবি করা হল ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড. ফিরোজ আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়নে বিশ্ববিদ্যালয়টির চার তরুণ এমন রোবট তৈরি করেছেন।

এই চারজন হচ্ছেন ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মো. রাকিন সরদার, সৈয়দ দিলশাদ হোসেন, বায়েজিদ আহমেদ ও মো. আছির আহসান। দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমসহ মেলায় আসা দর্শকদের কাছে ‘ধ্রুব’ নিজেদের তৈরি রোবট বলে দাবি জানায় বিশ্ববিদ্যালয়টি।

ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কমকে জানান, এই রোবট সম্পর্কে বিবরণ দিয়েছেন নির্মাণের দাবীদার ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মো. রাকিন সরদার। তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ করতে সক্ষম ধ্রুব। তাকে কমান্ড করলে সে অনুযায়ী কাজ করতে পারে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে।

রাকিন বলেন, ধ্রুবকে অধিকাংশ কমান্ড ইংরেজিতেই করতে হচ্ছে। তবে কিছু বাংলাতেও ইনপুট করা আছে। চেষ্টা চলছে বাংলাতেও যেন তাকে কমান্ড করা যায়। কথা বলানোর পাশাপাশি বাংলা এবং ইংরেজিতে যেন সে লিখতে পারে সে বিষয়েও কাজ চলছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে সে কাজটি আমরা করে ফেলবো আশা করছি। তিনি জানান, রোবটটির মেমোরি ডেভেলপমন্টসহ সবকিছুই বাংলাদেশে হয়েছে। মানুষের মতো দেখতে ও কাজ করতে পারা এটিই প্রথম বাংলাদেশি রোবট।

কিন্তু ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কমের অনুসন্ধানে মিলেছে তার ভিন্ন দৃশ্য। ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি তাদের স্টলে যে অত্যাধুনিক রোবটি প্রজেক্ট হিসেবে দেখিয়েছে সেটি মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা। অনুসন্ধানে রোবটটির সাথে হুবহু মিল পাওয়া গেছে ফ্রান্সের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলদেবারানের তৈরী ‘নাও’ (NAO) নামের একটি রোবটের।

‘ধ্রব’ রোবটের কার্যকারিতার যে বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, তার সাথেও হুবহু মিল আছে ২০০৮ সালে আবিস্কৃত ‘নাও’ রোবটটির। এমনকি জাপান ও বেলজিয়ামের মতো দেশে মানুষের বিকল্প হিসেবে বেশ কয়েকবছর ধরে ‘নাও রোবটের’ সফল ব্যবহারও হয়ে আসছে।

এদিকে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির এ জালিয়াতির বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচন। প্রমাণসহ বিভিন্ন পোষ্ট দিয়ে ফেসবুকে বলা হচ্ছে, ‘৮ হাজার ডলার দিয়ে রোবট কিনে সেটিং দিয়ে সেটা নিজেদের দাবি করা সত্যিই হাস্যকর।’

এ ব্যাপারে জানতে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সভাপতি মোস্তফা জব্বারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এই রোবট সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। এটার সাথে ব্যক্তি মোস্তাফা তো নয়ই বেসিসও কোনভাবেই জড়িত নয়। রোবট দেশি না বিদেশি বা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রোবট থাকবে কিনা সেটা আমাকে আগে থেকে অবহিত করা হয়নি। এর সকল দায়-দায়িত্ব আইসিটি ডিভিশনের।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি আমি এই রোবট নিয়ে আসতাম তাহলে রোবটকে দিয়ে বাংলায় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বোধনের অনুরোধ করতাম।’

ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের আয়োজক আইসিটি ডিভিশনের লিভারেজিং আইসিটি ফর গ্রোথ, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স (এলআইসিটি) প্রকল্পের টিম লিডার সামি আহমেদ ধ্রুব রোবট সম্পর্কে বলেন, ‘আমাকে জানানো হয়েছিল রোবটের হার্ডওয়্যার বিদেশ থেকে নিয়ে আসা আর আর্টিফিশিয়াল ও প্রোগ্রামিং করেছে আইইউবি।’

কিন্তু যে প্রোগ্রামিং বা আর্টিফিশিয়ালের কথা বলা হচ্ছে তা তো আগে থেকেই রোবটে ছিল। এখানে নতুন কি? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আসলে খোঁজ নিয়ে জানতে হবে এই রোবটে তারা কী ভ্যালু অ্যাড করেছে। আমি প্রোগ্রামের ঠিক আগের দিন এই রোবট সম্পর্কে জেনেছি বিস্তারিত আমার জানা ছিল না।’

এ ব্যাপারে জানতে মোবাইল ফোনে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির মিডিয়া অ্যান্ড পিআর বিভাগের এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হাসান সাইমুম ওয়াহেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন মতামত দিতে রাজি হননি। তবে ‘অফিসিয়ালি’ ইউনিভার্সিটিতে যোগাযোগের অনুরোধ করেন। এছাড়া রোবটের তত্ত্বাবধায়ক প্রফেসর ড. ফিরোজ আহম্মেদের নাম্বার চাইলে তার কাছে নেই বলে জানান।

ভিডিও দেখুন বিদেশীদের সাইটে, এখানে ড্যান্সও আছে:

এবার দেখুন বিদেশী সাইটের আলোচিত রোবট স্টোরী:

nao

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।