আমেরিকার গ্রাজুয়েট স্কুলের পড়ালেখা

প্রথমেই জানা দরকার গ্রাজুয়েট স্কুলটা আসলে কি জিনিস। আমেরিকাই যারা মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে আসে তারা মূলত গ্রাজুয়েট স্কুলের আন্ডারেই আসে এবং যারা মাস্টার্স বা পিএইচডি স্টুডেন্ট তাদেরকে গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট বলে। যারা গ্রাজুয়েট স্কুলে আসতে চাই তাদের তো বটেই সাথে অনেকেরই অনেক বেশি আগ্রহ থাকে যে আসলে কি পড়ায় আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে? বই পড়ায় নাকি রিসার্চ পেপার পড়ায় নাকি টিচারদের কিছু নোট বানানো আছে বছরের পর বছর এগুলো ক্লাসে এসে মার্কার দিয়ে হোয়াইট বোর্ডে লেখা শুরু করে আর স্টুডেন্টরা লেকচার তুলতে তুলতে হয়রান হয়ে যায়! পরীক্ষার সিস্টেম কি? গ্রেডিং কেমনে করে? ক্লাসে কতজন? আরো শত শত প্রশ্ন আর কিউরিসিটি! আমি এই আর্টিকেলে একটা জেনারেল ওভারভিউ দেওয়ার চেষ্টা করব। কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে লিখবেন কারণ ইনবক্সের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়না।

ডিগ্রী পেতে হলে কি কি কমপ্লিট করতে হবে? পিএইচডি এবং থিসিস বেস মাস্টার্সের বেলাই একটা নির্দিস্ট পরিমাণ কোর্স নিতে হয় এবং রিসার্চ করতে হয়। আমার ডিপার্ট্মেন্টে মাস্টার্সের জন্য মিনিমাম ৩০ ক্রেডিট সম্পন্ন করতে হবে যার ভিতর কোর্স নিতে হবে ২০-২৪ আর থিসিস ৬-১০। পিএইচডিতে সমপরিমান কোর্স কিন্তু আরো তিন বছর অতিরিক্ত রিসার্চ করতে হবে। একটা একটা কোর্স সিলেবাসের উপর ভিত্তি করে ১ থেকে ৪ ক্রেডিট পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রতিটা ডিপার্ট্মেন্ট অনেকগুলো কোর্স অফার করে এবং নিজের পছন্দ মত ২ বছরের ভিতর এই ২০-২৪ ক্রেডিট কমপ্লিট করতে হবে। সবগুলো কোর্স যে নিজের ডিপার্ট্মেন্ট থেকেই নিতে হবে ব্যাপার টা ঠিক এমন না, নিজের পছন্দ অনুযায়ী অন্য ডিপার্ট্মেন্ট থেকেও কোর্স নেওয়া যাবে কিন্তু প্রতিটা প্রোগ্রামের জন্য কিছু কোর কোর্স আছে যেগুলো অবশ্যই নিতে হবে।

ক্লাসে কতজন? ক্লাসে কতজন এটা ডিপেন্ড করে ওই সেমিস্টারে কতজন এই কোর্সটা নিবে তার উপর। সবাই যে একই ডিপার্ট্মেন্টের হবে এমন কোনো কথা না আবার সবাই যে একই ইয়ারের হবে এমনও না! আমার একটা ক্লাসে আমরা ১৩ জন। চারজন আমার ডিপার্ট্মেন্টের আর বাকিরা অন্য ডিপার্ট্মেন্টের, কেউ মাস্টার্সের কেউ আবার পিএইচডি স্টুডেন্ট। প্রথম সেমিস্টারে আমি তিনটা কোর্স নিয়েছি কিন্তু প্রতি কোর্সেই আলাদা আলাদা স্টুডেন্ট। ২ টা কোর্স আমার ডিপার্ট্মেন্টে আর বাকিটা ভাইরোলোজি ডিপার্ট্মেন্টে।

ক্লাসে পড়ানোর সিস্টেম, পরীক্ষা এবং গ্রেডিং: ক্লাসে সব টিচার পাওয়ার পয়েন্টে পড়ান। কিছু কোর্সে ক্লাসের আগেই স্লাইড আমাদেরকে দিয়ে দেয় আর কিছু কোর্সে লেকচারের পর দেয়। ক্লাস করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, এবং এটেন্ডেন্সের কোনো ঝামেলা নেই কিন্তু তারপরও কেউ ক্লাস মিস করে না। ক্লাসের টাইম ৫০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। আমার ৩ ক্রেডিট কোর্সে সপ্তাহে ২ টা করে আর ১ ক্রেডিটের জন্য ১ টা মোট ৫ টা ক্লাস এক সপ্তাহে। ৩ ক্রেডিট কোর্স গুলো শেষ করতে মোট ২৬ টা করে ক্লাস করতে হবে। একটা কোর্সে প্রতি মাসে ১ টা করে মোট ৪ টা পরীক্ষা দিতে হবে। প্রতি পরীক্ষায় ২৫% মার্ক। প্রতিটা পরিক্ষার আগ পর্যন্ত ক্লাসে যেগুলো পড়াবে ওইটাই সিলেবাস এবং একবার পরিক্ষা দেওয়া হয়ে গেলে সেটা আর জীবনেও পড়া লাগবে না!ওয়াও! আরেকটা কোর্সে ৩ টা এক্সাম, একদিন একটা প্রেজেন্টেশন দিতে হবে কোনো একটা রিসার্চ আর্টিকেলের উপর এবং একটা এসাইনমেন্ট আছে । এসাইনমেন্টের টপিক হল টিচার একটা রিসার্চ পেপার দিবেন যেটার স্ট্রং ও উইক পয়েন্ট গুলো খুজে খুজে বের করতে হবে এবং সুন্দর করে একটা অভারভিউ এর মত লিখতে হবে। পরিক্ষা গুলোর প্রশ্ন সব স্লাইড থেকেই থাকে কিন্তু হুবহু না, ক্রিয়েটিভ টাইপ হয় অনেকটা। মাল্টিপল চয়েস, শর্ট, ব্রড সব টাইপ প্রশ্নই থাকে। এ+ পেতে হলে ৯৫-৯৭% মার্ক পেতে হয়! ২.৫ এ গ্রেড চেঞ্জ। পাশ মার্ক ৬০ তে।

রিসার্চ: গ্রাজুয়েট লাইফের মুল গল্প আমি মনে করি রিসার্চে। প্রতিটা গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টের ডিপার্ট্মেন্টে একটা অফিস থাকে। ল্যাবের প্রেসার ডিপেন্ড করে অনেকটা প্রফেসরের উপর। প্রফেসর প্রেসার না দিলেও নিজের রেস্পন্সিবিলিটি থেকে অনেক কাজ করতে হয়। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট, পুরাতন এক্সপেরিমেন্ট রিপিট করা, রিসার্চ পেপার পড়ে নতুন আইডিয়া ডেভেলপ করা, এক্সপেরিমেন্ট ডিজাইন করা, ডাটা জেনারেশন, পাব্লিকেশন এগুলোই মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে থাকে। এটা আসলে আলাদা একটা জগত, এটাকে মেনে নিতে পারলে আর ভালবাসতে পারলে খুবই মজার। এখানে সফল হওয়াটা নির্ভর করে অনেকটা লাইফস্টাইলের উপর। কেউ আছে অপ্ল পরিশ্রমে অনেক বেশি আউটপুট নিয়ে আসে কেই সারাদিন গাধার মত খাটে কিন্তু আউটপুট কম। কেউ সারাদিন এক্সপেরিমেন্ট করে কিন্তু সুপারভাইজারের ডিরেকশন মোতাবেক, জানেই না সে যে রিয়েজেন্ট গুলো ব্যবহার করছে তার আসলে কাজ টা কি! মলিকুলার লেভেলে এটা কিভাবে কাজ করে, আবার কেউ এসব ব্যাপারে অনেক পটু। অনেকেই আছে গতানুগতিক, কোনোমতে ডিগ্রী পাওয়ার ধান্দাই থাকে আবার অনেকে খুব সিরিয়াস, কেউ কেউ সিরিয়াস কিন্তু সিস্টেমেটিক না এবং এদের আউটপুট কম। সুতরাং, সফল হতে হলে সিরিয়াস হলেই শুধু চলবে না, সিস্টেমেটিক হতে হবে। টাইমের ম্যানেজমেন্ট একটা গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার।

সেমিনার: গ্রাজুয়েট লাইফের আরেকটা ব্যাপার না বললে অপূর্ণতা থেকে যাবে সেটা হল সেমিনার গুলো। প্রতি সপ্তাহেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জাইগাই বিভিন্ন ধরনের অনেক সেমিনার হয় যেখানে অনেক স্টুডেন্ট, টিচার, গবেষকরা তাদের রিসার্চ প্রেজেন্ট করেন। অনেক টাইপের মানুষ সেখানে উপস্থিত থাকে, তারা বিভিন্ন টাইপের প্রশ্ন করে যেখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। সেমিনার গুলোতে অন্য ডিপার্ট্মেন্টের টিচার- স্টুডেন্টদের সাথে সাক্ষাত এবং বন্ধুত্বেরও একটা সুযোগ থাকে। নিজের জড়তা কাটাতেও এটা অনেক উপকারি।

এছাড়াও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের মিটিং, সিটিং তো থাকেই। এভাবেই ক্লাস, পরিক্ষা, ল্যাব, সেমিনার, মিটিং ইত্যাদি মিলেই হল গ্রাজুয়েট লাইফ!

লেখক- মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।