উচ্চশিক্ষার খোঁজে স্বপ্নের দেশ কানাডায়

উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা পৃথিবী জুড়ে খ্যাত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতি বছর অনেক শিক্ষার্থী পাড়ি জমাচ্ছে কানাডায়। পাশাপাশি আছে উন্নত জীবন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। কানাডায় ৯০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার সবকটিই সরকারি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কানাডায় বেশ কিছু বেসরকারি কলেজ ও ইনস্টিটিউট রয়েছে। বিশ্বায়নের জোয়ারে প্রতিযোগিতাপূর্ণ চাকরির বাজারে কানাডার মানসম্মত শিক্ষা আপনাকে পেশাজীবনেও সফল হতে সাহায্য করবে। তাই যাঁরা বিদেশে উচ্চশিক্ষার কথা ভাবছেন, তাঁরা নির্দ্বিধায় বেছে নিতে পারেন কানাডা। তবে এজন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও প্রোগ্রাম সম্পর্কে রাখতে হবে পর্যাপ্ত খোঁজখবর।

 

ডিগ্রির ধরন:

কানাডায় একজন শিক্ষার্থী ইচ্ছা করলে ফুলটাইম অথবা পার্ট-টাইম পড়াশোনা করতে পারে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট, পোস্টগ্র্যাজুয়েট, ডক্টরাল/পিএইচডি প্রোগ্রাম,ডিপ্লোমা ডিগ্রি ছাড়াও এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে কো-অপারেটিভ এডুকেশন, ডিস্ট্যান্টলার্নিং, কন্টিনিউয়িং এডুকেশন এবং স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মতো আরও অনেক কোর্স ও পদ্ধতি। রুম, ল্যাবের বাইরেও এখানে আপনি পাবেন শিক্ষার দক্ষতাবৃদ্ধির জন্য ওয়ার্কশপ ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন স্কলারশিপ। বিষয় ভেদে কানাডায় আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সের মেয়াদ চার বছর, পোস্টগ্র্যাজুয়েটকোর্স এক-দু’বছর এবং ডক্টরাল পর্যায়ে কোর্সের মেয়াদ হয়সাধারণত চার বছর।

 

যে বিষয়ে পড়তে যেতে চান:

কম্পিউটার সায়েন্স, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ফুডসায়েন্স, মেডিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সার্ভিসেস, ফার্মেসি, নার্সিং, বায়োলজি, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ডরিসোর্সেস, ইলেক্ট্রনিক্স, মেরিন অ্যাফেয়ার্স, ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট, এগ্রিকালচার ইকোনমিক্স, অ্যাপ্লায়েড কম্পিউটার সায়েন্স, অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাসট্রনমি, অ্যাপ্লায়েড জিওগ্রাফি, আর্কিটেকচারাল সায়েন্স, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ডএনভায়রনমেন্টাল হেলথ, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, হোম ইকোনমিক্স, এডুকেশন, ইংলিশ থিয়েটার, ফিলোসফি, মিউজিক, ইকোনমিক্স, ইতিহাস ও রিলিজিওন, আইনসহ আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে প্রায় দশ হাজার বিষয় এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে প্রায় তিনহাজার বিষয়ের মধ্য থেকে আপনি আপনার চাহিদা ও যোগ্যতানুযায়ী বিষয় বেছে নিতে পারেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি ও বিষয় খোজ করতে এই ওয়েবসাইট গুলোতে দেখতে পারেন-

http://www.universitystudy.ca/search-programs/

http://www.aucc.ca/programs-services/

http://www.ouac.on.ca/
ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা:

আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে ভর্তির জন্য কমপক্ষে ১২ বছরের শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে। পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রির জন্য লাগবে ১৬ বছরের শিক্ষাগত যোগ্যতা। কানাডায় উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ-এ দুটোভাষার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এই দুটোর যেকোনো একটি ভাষাপড়তে পারবেন। ইংরেজি ভাষার প্রতিষ্ঠানগুলো ভাষাগত যোগ্যতা হিসেবে IELTS, TOFEL কেই প্রাধান্য দেয়, তবে কিছু কিছু ইউনিভার্সিটি GMAT, GRE কেও প্রাধান্য দেয়। এই কোর্সগূলোর স্কোর ইউনিভার্সিটি ভেদে এক এক রকম হয়। ফ্রেঞ্চ ভাষার প্রতিষ্ঠানে পড়তে চাইলে ওই প্রতিষ্ঠানে ফ্রেঞ্চ ভাষার ওপর লিখিতপরীক্ষা দিতে হয়। এটি তারা নিজস্ব নিয়মে নিয়ে থাকে। কানাডায় পড়ালেখার জন্য শক্তপৃষ্ঠপোষকতা দেখাতে হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের IELTS, TOEHL স্কোর জানতে এই ওয়েবসাইটে ডু মারতে পারেন-

http://www.degrees.ca/ielts/

http://www.degrees.ca/toefl/
ভর্তির সেশন:

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তির সেশন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের ওপর। তবে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে মে পর্যন্ত সেশন থাকে। এ ছাড়া জানুয়ারি মে মাসেও কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন শুরু হয়।

 

ভর্তি:

বাংলাদেশ থেকে ভর্তির জন্য ডাইরেক্ট এপ্লাই করা একটু কষ্টসাধ্য তবে আন্তর্জাতিক ক্রেডিটকার্ড থাকলে কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েব সাইটে গেলেই দেখবেন শুরুর পেইজে “প্রোস্পেক্টিভ স্টুডেন্ট” অথবা “ফিউচার স্টুডেন্ট” নামে একটি লিঙ্ক আছে। এখানে ক্লিক করলে জানতে চাইবে আপনি কোন লেভেলে আগ্রহী। এখানেই পাবেন প্রয়োজনীয়সব তথ্য, যোগ্যতা ও আবেদনপত্র। অনলাইনে আবেদনের পরে আপনাকে ৫০ থেকে ১৫০ ডলার আবেদন ফি দিতে হবে। এই ফি না দিলে এপ্লাই করাটা কোন কাজে আসবেনা। টাকা দেওয়ার আগে জেনে নিবেন সেটা কি ঠিক সাইট। অনেক সময় ভুয়া সাইটে প্রতারিত হতে পারেন। অনেকসময় আ্যপ্লিকেশন প্যাকেজে স্টেটমেন্ড অব ইন্টারেস্ট বা প্ল্যান অব স্টাডি লিখতে হয়। এটি মাস্টার্স লেভেল-এর জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও পিএইচডি’র জন্য খুবই দরকারী। তারা দেখতে চায় আ্যপ্লিক্যান্টদের রিসার্চ ইন্টারেস্ট কোন দিকে। কোন স্পেসিফিক একটা এরিয়াতে ফোকাস না করে কয়েকটি এরিয়াতে ইন্টারেস্ট দেখানো আমার মনে হয় ভালো। তবে ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরদের ওয়েবসাইট দেখে সে মোতাবেক একটা প্ল্যান তৈরী করা উচিৎ। আর একটি দরকারী জিনিস হল রেকমেন্ডশন লেটার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এই সব রেকমেন্ডশন লেটার পড়ে। রেকমেন্ডশন লেটার হল আপনার একাডেমিক এবং গবেষণা করার যোগ্যতা মূল্যায়ন সম্পর্কিত একটি পত্র যা সাধারণত আপনার কাজের সাথে পরিচিত প্রফেসর দিতে পারেন। সাধারণত ২-৩টি লেটার দরকার হয়। এর জন্য ইউনিভার্সিটিগুলোর নিজস্ব ফরম রয়েছে। আবেদনের সময় আপনি যে শিক্ষকদের কে রেফার করবেন তাদের নিকট ওই ইউনিভার্সিটি থেকেই ইমেইলে লিঙ্ক পাঠায়। তাই আগে থেকেই যে শিক্ষকদেরকে রেফার করবেন তাদেরকে জানিয়ে রাখবেন। ভাল রেকমেন্ডশন লেটার না হলে ভর্তির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

 

স্কলারশিপ:
কানাডায় পড়তে যেতে আগ্রহীদের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বৃত্তি দেয়। শিক্ষার্তির একাডেমিক রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করে বৃত্তি দেওয়া হয়ে থাকে। তবে যারা শুরু থেকেই বৃত্তি নিয়ে যেতে চান তাদের ক্ষেত্রে IELTS, TOEFL, GRE, GMAT প্রভৃতি স্কোর ভালো থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কানাডা সরকার আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ প্রোগ্রাম নামে একটিবৃত্তি দেয়। এছাড়া কানাডা মিলেনিয়াম স্কলারশিপ ফাউন্ডেশন, ওন্টারিও গ্র্যাজুয়েট বৃত্তি প্রোগ্রামসহ নানা ধরনের বৃত্তির প্রোগ্রাম চালু আছে। কানাডা সরকারের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটেও আপনি বৃত্তির বিস্তারিত খোঁজখবর পাবেন। অনেক ডিপার্টমেন্ট আছে, বিশেষত প্রকৌশল বিভাগ গুলো, যেখানে প্রফেসরই ফান্ড দেয়। সেসব ক্ষেত্রে পরিচিত কারো সাথে যোগাযোগ করে প্রফেসরদের ফান্ডের অবস্থা সম্পর্কে আগেভাগে জানতে পারলে সে মোতাবেক আ্যপ্লাই করলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তবে কিছু কিছু সাবজেক্টে মাস্টার্স বা পিএইচডি করার জন্য ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরদের সাথে যোগাযোগ করার দরকার হয়না। সেখানে ডিপার্টমেন্টই নির্ধারণ করে কাকে ফান্ড দেয়া হবে এবং তা কিভাবে।

স্কলারশিপের জন্য বিস্তারিত দেখতে পারেন-

http://www.scholarshipscanada.com/

http://www.scholarships-bourses.gc.ca/scholarshipsbourses/index.aspx?view=d&lang=eng

http://www.scholarshipscanada.com/Scholarships/FeaturedScholarships.aspx
টিউশন ফি  থাকার ব্যাবস্থা:

কানাডার সব বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি একই রকম হয়না। অঞ্চল ও পড়ানোর প্রোগ্রাম ভেদে টিউশন ফিও ভিন্ন ভিন্ন হয়। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর টিউশন ফি বেশি হয়। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য খরচ পড়বে প্রতি বছর ৫ থেকে ২০ হাজার ইউএস ডলার এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট, ডক্টরাল ও অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রির জন্য খরচ পড়বে ৬ থেকে ২০ হাজার ইউএস ডলার বা তারও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থাকতে হলে ভালোই খরচ গুনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মে থাকলে খাওয়ার খরচ(মিল প্ল্যান) আলাদা ভাবে কিনতে হয়। ডর্মে থাকা বাঙ্গালী শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল খাওয়া। ডর্মে থাকা অনেক ব্যায়বহুল কিন্তু ঝামেলামুক্ত। যারা ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন তাদের খরচ একজনের জন্য এরকম হয়। সাধারনত থাকা খাওয়া সহ প্রতিদিন গড়ে দশ-বার ডলারের মত খরচ হয়। বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি ও থাকার জন্য বিভিন্ন শহরের ব্যায় সম্পর্কে ধারনা পেতে এই ওয়েবসাইটগুলোতে ঘুরে আসতে পারেন-

http://www.univcan.ca/universities/facts-and-stats/tuition-fees-by-university/

http://www.erieri.com/CareerPlanning/Student-Cost-of-Livinghttp://www.abroadeducation.com.np/study-in/canada/living-cost.html
খন্ড কালীন কাজের সুযোগ:

কানাডায় শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ। সপ্তাহে একজন শিক্ষার্থী ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। শিক্ষক সহকারী, বিক্রয়কর্মী, ফুডক্যাটারিং, গবেষণা সহকারী, কম্পিউটার ওয়ার্কসহবিভিন্ন খণ্ডকালীন কাজ শিক্ষার্থীরা করতে পারেন। এছাড়া যারা আন্ডার গ্রেড লেভেলে পড়তে আসে তারা সামার সেশনে(মে-আগস্ট) পুরো সময়েই কাজ করতে পারে।

ক্রেডিট ট্র্যান্সফারের সুবিদা:

বাংলাদেশে থেকে কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া কানাডায় এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রেডিট ট্রান্সফার করা যায়। পোস্টগ্র্যাজুয়েট ও আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়েই মূলত ক্রেডিট ট্রান্সফার হয়। তবে ক্রেডিট ট্রান্সফার কত শতাংশ পর্যন্ত করা যাবে তাতে বিশ্ববিদ্যালয় শর্তারোপ করে।
শেষকথা:

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পুরনের জন্য কানাডা অন্যতম। বিদেশী ছাত্রদের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত কানাডায় থেকে যায়। কানাডায় পড়াশুনার মান ভাল হলেও এখানকার সবচেয়ে খারাপ দিক হল এর আবহাওয়া। শীতকালে তাপমাত্রা প্রদেশভেদে মাইনাস ৫০ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়। আবার গরমকালেও ভালই গরম পড়ে। তবে জলবায়ু যাই হোক, কানাডায় লিভিং সত্যিই নির্ঝঞ্জাট। এখানকার মানুষগুলো খুবই আন্তরিক। ভাল নাগরিক জীবন, নিরাপদ, সুন্দর সুখীময় জীবন যাপনের জন্য কানাডা পৃথিবীর অন্যতম দেশ।

নূর হোসেন সোহাগ 

পিএইচডি গবেষক 

ল্যাকহেড ইউনিভার্সিটি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।