বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে প্রার্থীদের সামনে চার ‘চ্যালেঞ্জ’

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা রোধে নিয়োগের সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চারটি ধাপ মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের মুখোমুখি হতে হবে চারটি চ্যালেঞ্জের। ইউজিসি সুপারিশ করেছে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং ডেমো ক্লাস নেওয়ার। আর পুলিশ ভেরিফিকেশনের সুপারিশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতা ও উপাচার্যরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি যে নির্দেশনা দেবে তা মানতে বাধ্য নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৩৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। সংখ্যাটা বাড়ছে ধীরে ধীরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সেখানে শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন নিয়োগ হয় নিয়মিত। কিন্তু এসব নিয়োগে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ জমা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে। ফলে এসব সমস্যা সমাধানে গত মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক পরিপত্রের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি পুলিশ ভেরিফিকেশনের পদ্ধতি রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা পাঠায়। অন্যদিকে ইউজিসি তাদের ৪২তম বার্ষিক প্রতিবেদনে এন্ট্রি লেভেলে (প্রারম্ভিক পর্যায়) শিক্ষক নিয়োগে এই তিন ধরনের বাছাই প্রক্রিয়া ছাড়াও ডেমো ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা রাখার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে বলে সুপারিশ করে।

ইউজিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও পুল গঠন করা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পেশায় আকৃষ্ট করতে চাকরির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় স্বায়ত্তশাসনের ধারণা সমুন্নত রেখে ১৯৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় সংস্কার বাঞ্ছনীয় বলেও সুপারিশ করে কমিশন।

এ বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার জন্য এই বিষয়গুলো যোগ করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করেছি। তারই প্রেক্ষিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুই দফায় নির্দেশনা পাঠিয়েছি। এখন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির এমন নির্দেশনার বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি যে নির্দেশনা দিচ্ছে তা আমরা অনেক আগে থেকেই মেনে চলি। তাছাড়া আমরাও চাই মেধাবী কোনও শিক্ষার্থীকেই শিক্ষক হিসেবে নিতে। ডেমো ক্লাস বলতে যা বুঝানো হচ্ছে তা বর্তমানে প্রচলিত মৌখিক পরীক্ষা মধ্যেই নেওয়া হয়।’

পুলিশ ভেরিফিকেশনের সমালোচনা করে ড. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে বলছে পুলিশ ভেরিফিকেশন করতে; আমরা সেটা তো করিই। কিন্তু গতানুগতিক ভেরিফিকেশন করতে গেলে কেউ কেউ রোষানলের শিকার হন। কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হলেও তাকে শত্রুতা করে জামাত-শিবির বলে তার ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আমাদের চোখের সামনে হাতে গড়া শিক্ষার্থীদেরকে তো আমরা চিনি। তবে একদমই যে অনিয়ম হয় না তাও নয়। এমন অনিয়ম সবখানেই হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলেই যে কোনও নির্দেশনা দিতে পারে। তবে সেটা মানতে বাধ্য নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের নিজেদের পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকে।’

এদিকে গতমাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাওয়া এক গোপনীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হয়, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়, এতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। তাই মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নিতে এবং নিয়োগের পূর্বে পুলিশ ভেরিফিকেশন বা গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই করার পরামর্শও দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গোয়েন্দা নির্দেশনার পর আমরা ইউজিসির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি। এটা এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মতামত নিয়ে তারপর বাস্তবায়ন করতে হবে।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।